|

চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন — পর্ব ১

চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন — পর্ব ১
সাহিত্য — ধারাবাহিক উপন্যাস · সেপ্টেম্বর ২০২৬ · পর্ব ১

চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন

— নাসীমুল বারী

এক.

পড়ন্ত দুপুর। শনিবার হলেও আজ স্কুল খোলা ছিল। দুপুরে ক্লাস ছুটির পর স্কুলগেটের বাইরে আসে সৌরভ, রাফিদরা অনেকেই। সেখানে কলেজ শাখার চার পাঁচ জন বড়ো ভাইয়ার একটা জটলা। গেট দিয়ে ওরা বের হতেই ওদেরকে ডাকে এক বড়ো ভাইয়া। সৌরভ ও রাফিদ যায়। উত্তেজনায় সে বলে, এই শোনো, কাল থেকে বাংলা ব্লকেড শুরু হচ্ছে! এ আন্দোলন পালটে দেবে ইতিহাস!

‘ইতিহাস পালটাবে’, ‘বাংলা ব্লকেড’ আচমকা এমন শব্দ ও কথাগুলো শুনেই কেমন যেন একটা কাঁপুনি ধরে যায় সৌরভের মনে। এটা কি নতুন কোনো খেলা? নাকি রোবট বা গেমের নাম? রাফিদও তাকিয়ে থাকে বড়ো ভাইয়াটার দিকে! না, বড়ো ভাইয়ার চোখ-মুখ দেখে সৌরভ বুঝতে পারে, এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা।

রাফিদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভাইয়া, এটা আবার কী?

কিছুটা উত্তেজিত বড়ো ভাইয়ারা আরো কিছু শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করছিল। রাফিদের কথায় একজন বলে, এটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিবাদ। যারা পরিশ্রম করে, মেধা দিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য একটা ন্যায়ের লড়াই। শুধু ঢাকাতেই না, দেশের সব জায়গায় অবরোধ হবে, এটাই বাংলা ব্লকেড! এতদিন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিল। এবার আমরা তোমাদেরকেও চাই যুক্ত করতে। এটা তোমাদের ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন। মেধার লড়াই কিন্তু তোমাদেরও। তোমরা সবাই শাহবাগে থাকবে কাল বিকেলে। মনে থাকবে তো?

বাসায় ফিরতে ফিরতে ওরা কয়েকবার আওড়ায় ‘বাংলা ব্লকেড’, ‘মেধার লড়াই’- এসব কী বলছে? কেন শাহবাগে যেতে বলছে? ওরা তো ছোট, তারপরও কেন বলছে যেতে? ওদের ভবিষ্যতে প্রয়োজন। কী এটা! অনেক প্রশ্ন মনে? অনেক জিজ্ঞাসা মনে? অনেক বিস্ময়ও! কিন্তু আবার এটা নতুন কিছু- এমন একটা ভাবনায় ওদের মনে শিহরনও জাগে।

হাঁটতে হাঁটতে মাঠের কাছে আসতেই দেখা হয় তানভীর ও জামানের সাথে। বাসার কাছেই মাঠ। সবাই একই ক্লাসে নাইনে পড়ে। তবে চারজন তিন স্কুলে। স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরতে এভাবে সাধারণত দেখা হয় না। কখনো কখনো হয়, আজও দেখা হয়ে গেল। কৌতূহল ও শিহরনের উত্তেজনায় সৌরভ এগিয়ে তানভীরকে বলে, কাল থেকে নাকি শাহবাগে বাংলা ব্লকেড। শুনেছিস কিছু তোরা?

সৌরভকে সমর্থন দিয়ে রাফিদও বলে, শুনেছিস কিছু তোরা?

—বাং-লা ব্ল-কে-ড…! তানভীর, জামান দুজনেই বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী এটা রে! তোরা জানলি কোত্থেকে?

—স্কুল থেকে। সৌরভ বলে।

জামান বলে ওঠে, এই ফেসবুকে যেমন কাউকে ব্লক করা হয় তেমন কিছু কি?

বিকালে মাঠে আসে ওরা। ক্রিকেট খেলবে। কিন্তু তানভীর আর জামানের চোখে কৌতূহলী এক স্পন্দন ধরা পড়ে। —বাং-লা ব্ল-কে-ড…! কী বিষয় ওটা!

সৌরভ একটা ভাব নিয়ে বলে, এখন বাদ দে, খেলা শুরু কর। কাল শাহবাগে যাবি, তখন দেখবি জানবি সবাই, কী এটা!

আজ চব্বিশের ৭ জুলাই, রবিবার। বিকাল ৩টা থেকে শাহবাগে বাংলা ব্লকেড অবরোধ কর্মসূচি চলছে। এ অবরোধ শিক্ষার্থীদের অবরোধ। শিক্ষা শেষের পেশাগত জীবনে যারা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত চাকরিতে যেতে চায় তাদের মেধাকে সংকুচিত করা হয় কোটার আওতায়। চুয়াল্লিশ শতাংশ সুযোগ পায় মেধা পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা। তুলনামূলক কম নম্বরে উত্তীর্ণরা কোটার আওতায় অবশিষ্ট ছাপ্পান্ন শতাংশ সুযোগ পায়। পরিশ্রম আর মেধার মূল্যায়নে মাত্র চুয়াল্লিশ শতাংশ এটাই বৈষম্য।

এ আন্দোলন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, সরকারের বিরুদ্ধে নয়। একসময় কিছু শ্রেণির জন্য কোটা ছিল প্রয়োজনীয়। সময়ের প্রয়োজনেই তখন তা চালু হয়েছিল। কিন্তু ওই গুরুত্ব ও প্রয়োজন তো অনাদিকালের জন্য হতে পারে না। তাই এ আন্দোলন হলো কোটার সংস্কারের মাধ্যমে মেধার ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

আজ বিকালে শাহবাগে আসে সৌরভ রাফি তানভীর জামান ও লাবিব। শুধু লাবিবই ওদের চেয়ে এক ক্লাস নিচে এইটে পড়ে। ওদের সবার মনে কৌতূহল। বাংলা ব্লকেড নিয়ে ওদের বিস্ময় শিহরনের কমতি নেই। এখানে এসে দেখে, হাজারো ছাত্র-ছাত্রী প্ল্যাকার্ড হাতে মধ্য রাস্তায় বসে স্লোগান দিচ্ছে—

“দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক!”
“তারুণ্যের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার!”
“জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।”
“আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।”

আমরাও চাই না কোটা। ওরা সবাই বলে। পরক্ষণেই জামান বলে, তাইতো কদিন আগে আমার মাকে বাবা বলছেন, কোটাটা না ওঠালে তোমার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ ভালো না।

সৌরভ বলে, যাহ্! কিছুই জানিস না। আমরাও শিক্ষার্থী। আমরাই তো বড়ো হবো একদিন। শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য মানে আমাদের প্রতিও। অন্যায়টা তো সবার ওপরেই পড়ে। বৈষম্যের কষ্ট ছুঁয়ে যায় সবাইকে, তাই না? তাই আমরা এখানে এসেছি।

শেষ বিকেলের আকাশে তখন লালচে আলো। সৌরভ ভাবে আজকের দিনটা শুধু একটা ব্লকেড দেখা নয়, নতুন কিছু জানা ও শোনার।

চলবে…

উৎস: 04. Sahitto / ধারাবাহিক উপন্যাস-1 September 2026.doc · চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন