সাহিত্য — গল্প · সেপ্টেম্বর ২০২৬
টিফিন
— তায়েবা তানহা
ইশ… আজ স্কুলে যেতে দেরি হয়ে গেল। আর তাইতো এই কাঠফাঁটা রোদে মাঠে লেট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। আজ রবিবার। রবিবার এলে ভীষণ ভয়ে থাকি। কেননা, ঢাকা শহর মানেই জ্যাম আর যদি রবিবার হয় তবে ধরেই নিতে হবে যে গন্তব্যে আর যাওয়া হচ্ছে না নির্দিষ্ট সময়ে।
মন খারাপ আর ভয়ে আমি তো অস্থির। আমাদের নতুন প্রধান শিক্ষিকা এসেছেন। বেশ কড়া। তাঁর নতুন নিয়ম যারা যারা দেরিতে আসবে তাদের নাকি মাঠের মধ্যে লেট লাইনে সারি হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা শুনেছি বড় ম্যাম নাকি শাস্তি-তাস্তিও দেয়। বাবা… আমার ভয়েই পা কাঁপছে। আসলে স্কুলে আসতে কখনও দেরি হয় না। সব সময়ই আগে এসে স্কুলে উপস্থিত হই। কিন্তু আজ কি যে হলো! বাসা থেকে বেরোতেই দেরি হয়ে গেছে। যাই হোক, বড় ম্যাম মাঠে উপস্থিত হয়ে আমাদের দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আছেন। বড় ম্যামকে দেখে আমি সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর না দিয়েই বলল, সালাম দেয়া হচ্ছে, স্কুলে দেরি করে আসা কত বড় অপরাধ তা জানো? আমার তো ভয়ে পা অবশ হয়ে গেছে। আমি সোজা মাটির দিকে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন দেরি করে এসেছ কেন? নিচ থেকে চোখ উঠিয়ে আড়চোখে ম্যাম এর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আমাকেই জিজ্ঞেস করছেন। না, না, মা, মা মানে আসলে হয়েছিলো কি? জ, জ, জ্যামে প, পড়েছিলাম। বড় ম্যাম ধমকের সুরে বলে, শাস্তি পেতে হবে সকলকে। আমার তো এবার মরার উপক্রম। ম্যাম বলে উঠল, মাঠ— এ মাঠ পরিষ্কার করতে হবে তোমাদের। একটা ময়লা যদি থাকে মাঠে তবে তোমাদের খবর আছে। আমি তো শাস্তির ধরন শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম নিশ্চয়ই শাস্তি হিসেবে ম্যাম নীল ডাউন না হয় মুরগি বানিয়ে রাখবে। যাগগে, একটা করে ঝুড়ি নিয়ে সকলে ময়লা পরিষ্কারের কাজ শেষ করে ক্লাস রুমে গেলাম। ক্লাসে শারমিন ম্যাম। বাংলা পড়াচ্ছেন। আমাকে দেখে কিছু না জিজ্ঞেস করেই তিনি ক্লাসের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেন। ক্লাসে ঢুকে দেখি সামনের সকল বেঞ্চ ভরা। এখন পেছনেই বসতে হবে। হঠাৎ পেছনের আগের বেঞ্চে দেখি একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার নাম ঠিক জানি না। এ বছরই নতুন ভর্তি হয়েছে। বেশ চুপচাপ আমাদের কারো সাথে কথা বলে না। আমি বেঞ্চে পাশে গিয়ে মেয়েটাকে বলি, আমি কি এখানে বসতে পারি? মেয়েটি সরে জায়গা দিয়ে বলল, অবশ্যই। আমি বেঞ্চে বসে ব্যাগটা পাশে রেখে বাংলা বইটা বের করে বলি, আচ্ছা তোমার নাম কি?
-মিথিলা।
—ও আচ্ছা, তোমার নাম কি? মেয়েটা পাল্টা জিজ্ঞেস করে।
—ইমি।
ঘন্টা পড়ল। ম্যাম ক্লাস থেকে বের হতেই ওকে জিজ্ঞেস করি তোমার মায়ের নাম কি, বাবার নাম কি, তারা কি করে, আগে কোন স্কুলে পড়তে। মিথিলাও হাসি মুখে উত্তর দেয়, আমার মায়ের নাম সুরাইয়া, বাবার আশরাফুল ইসলাম। তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন। আমি আগে মিরপুরে থাকতাম। সেখানকার একটি প্রাইভেট স্কুলে পড়তাম।
—ও, ভালো।
আড্ডা আলোচনায় বেশ জমে উঠেছে আমার আর ও কথোপকথন। ওর সাথে কথা বলতে পেরে বুঝলাম যে মেয়েটা ভারি মিশুক ও খুব বাচাল। কেননা অনেক কথা বলে। ওর কথাগুলো খুব মজার, শুনলেই হাসি পায়। সব সময় হাসি মুখে কথা বলেই চলে।
—আচ্ছা তুমি এতদিন আমাদের সাথে কথা বলতে না কেন?
—আসলে, নতুন তো তোমাদের সাথে কথা বলতে সাহস হয়নি। কে কি মনে করে কে জানে। মিথিলা উত্তর দেয়।
—তা ঠিক।
আমার আর ওর বন্ধুত্ব বেশ জমে উঠেছে। আমরা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু। এক সাথে বসে খুব মজা করি। আসলে আমরা দুইজনই বাচাল তো তাই আমাদের বেশ জমে। আমরা সব সময় এক সাথে টিফিন করি। আগে কখনও এভাবে কারো সাথে আমি টিফিন ভাগাভাগি করে খাইনি। বেশ ভালো টিফিন আনে মিথিলা রোজ। কোনো দিন বিরিয়ানি তো কোনোদিন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আবার কোনোদিন ফ্রাইড রাইস। ওর টিফিনগুলো খেতেও বেশ মজা। কিন্তু আমার তেমন রকমারি টিফিন আনা হয় না। আসলে ছোট ভাই-বোন ও সংসারের চাপে আমাকে এসব রকমারি টিফিন দিতে পারে না বলে প্রতিদিন ভাজি রুটি আর রুটি ডিম দেয়। আমিও স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে নেই। কিন্তু সমস্যা হলো মিথিলার আমার টিফিনগুলো পছন্দ হয় না। ফলে ও আমার টিফিন খায় না। এতে কোনো সমস্যা না থাকলেও বেশ কিছু দিন যাবত লক্ষ্য করছি ও আমায় নানারকম কথা শোনায়। যেমন : কি এনেছিস? একই টিফিন বারবার আনে কেউ। তোর টিফিনগুলো দেখতে কেমন, আমার টিফিনগুলো দেখ কত সুন্দর। ইত্যাদি। নানা কথা। প্রথম দিকে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিলেও এখন আমাদের মধ্যে টিফিন খাওয়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। মাঝে মধ্যে ঝগড়ায়ও রূপ নেয়।
আজ বুধবার। তৃতীয় পিরিয়ড। গণিত ক্লাস। হঠাৎ ঘন্টা পড়তেই ক্লাসের সকলে হৈ হৈ করে বাইরে মাঠে চলে গেল। তার আগে অবশ্য ম্যাম ক্লাসরুম ত্যাগ করেছে। আমি আমার টিফিন বক্সটা বের করি।
-কি এনেছিস? সেই প্রতিদিনকার ভাজি রুটি মিথিলা জিজ্ঞেস করে?
– না, আসলে আজ আম্মু একটু সময় করে নুডুলস বানিয়ে দিয়েছে। আমি উত্তর দেই।
-মিথিলা টিফিন বক্স বের করে বলে দেখ আমি আজ চাওমিন এনেছি। অনেক মজা। জানিস আমার আম্মু খুব ভালো বানায়।
-আমার মাও ভালো বানায়।
-না, আমার মা একটু বেশি ভালো বানায়। আমার মায়ের চাওমিন অনেক মজা। এর তুলনা হয় না। মিথিলা জবাব দেয়।
আমি হেসে বলি, যাহ— তোর মায়ের চাওমিন মজা না। এতবার বলা লাগে। আমি আমার নুডুলসটা খেতে থাকি। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি ও গোমরা মুখে টিফিন খাচ্ছে। আমি ওর মন খারাপ হতে দেখে ওর কাছে গিয়ে বলি, দে আমি তোর টিফিনটা খাই। তুই রাগ করছিস কেন? আমি তো মজা করেই বললাম। মজাও বুঝিস না। আমি মিথিলার চাওমিনটা খেয়ে ওর দিকে আমার নুডুলসটা এগিয়ে দিয়ে বলি নে তুইও খা। আজ তো আর সমস্যা নেই এটা খেতে। ও আমার নুডুলসটা থেকে এক চামচ নুডুলস খেয়ে আমার টিফিন বক্সটা দূরে সরিয়ে দিয়ে বলে, কি নুডুলস এনেছিস। নুডুলসটা কি খাওয়া যায়। কেমন দলা পাকিয়ে আছে। আবার বলে আমার চাওমিন খেতে খারাপ। আমার খুব রাগ হলো। কি করলো এটা মিথিলা। খুব ঝগড়া করি মিথিলার সাথে আজ। ঝগড়ার মাঝে ব্যাগ গুছিয়ে ওর বেঞ্চ ছেড়ে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসি। কান্না পায়। কেউ কি টিফিন নিয়ে ঝগড়া করে। ছিঃ ছিঃ কি বিষয় নিয়ে ঝগড়া করলাম। নাহঃ ওর সাথে কথা বলব না ওর টিফিনও খাব না। মিথিলাও গাল ফুলিয়ে বসে আছে। একবারও এসে বলল না যে আমার ভুল হয়েছে। সরি, আর হবে না। চল এক সাথে বসে টিফিন করি। ঘন্টা পড়তেই চিন্তায় ছেদ পড়ে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হলো। ইংরেজি ক্লাস। একটু পরেই ইংরেজি ম্যাম আসেন। এসে বলেন, আজ আর তোমাদের ইংরেজি ক্লাস করাব না। তোমাদের সবাই নিশ্চয়ই ক্লাস করতে করতে একখেয়ামি লাগে। সবাই উচ্চস্বরে বলে, জ্বি ম্যাম। তাহলে চল আমরা সবাই মিলে এমন একটা কাজ করি যা আমাদের জীবনে সহায়তা করবে। ক্লাসে রুনা দাঁড়িয়ে বলে, সেটা আবার কেমন? ম্যাম বলেন, বসো। আমার কথা শুনো তাহলেই বুঝতে পারবে। ম্যাম এবার বলা শুরু করল, তোমাদের আমি একটা করে কাগজ দেব। তোমরা সেই কাগজে নিজেদের সমস্যার ও কষ্টের কথা লিখে আমার কাছে জমা দেবে। ক্লাসের সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ম্যাম বলেন, অস্বস্তির কোনো কারণ নেই। আমি কাউকে কারও সমস্যা বা কষ্টের কথাগুলো বলব না। রুনা আবার দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ম্যাম আপনি আমাদের সমস্যার কথা জেনে কি করবেন। ম্যাম বলেন, আমি তোমাদের সমস্যা বা কষ্টের কারণগুলো সমাধান করব। তোমরা সবাই কি রাজি আমার প্রস্তাবে। সবাই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। ম্যাম সবাইকে একটা করে কাগজ দিলো। আমি কাগজটা পেয়ে ভাবলাম, আমি কি লিখব। পরোক্ষণে আমার আজ যা ঘটল তার কথা মনে পড়ল। আজ যা ঘটেছে তা তো আমাকে কষ্টই দিয়েছে। আমি আজকের টিফিনের ঘটনার কথাই লিখব। দেখি কি সমাধান পাই। আমি কাগজে সম্পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিই। তারপর কাগজটা ভাজ করে ভাজের উপরে নিজের নাম লিখে ম্যামকে জমা দিই। ঘন্টা পড়তেই ম্যাম সবার কাগজটা জমা নিয়ে ক্লাস রুম ত্যাগ করে। আর আমিও ম্যামের আবার ক্লাসে আসার অপেক্ষায় থাকি।
আজ শনিবার। দ্বিতীয় পিরিয়ড। ইংরেজি ম্যামের ক্লাস। আমি বেশ অস্থির। কখন ম্যাম ক্লাসরুমে আসবেন। হঠাৎ আমার চিন্তাকে ঘুচিয়ে দিয়ে ম্যাম ক্লাসে আসলেন। সালামের ধ্বনিতে মুখরিত হয় ক্লাসরুম। আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলি, ম্যাম সমস্যার সমাধানগুলো কি দেবেন না।
—ও, হ্যাঁ। দেবো। তোমরা সবাই শান্ত হয়ে বসো। ম্যাম একের পর এক সমাধানের কথা বলে গেলেও আমি যে সমস্যার কথা লিখেছি তার সমাধানের কথা একবারও বলেননি। হঠাৎ ম্যাম আমাকে ও মিথিলাকে ডাক দেন। তিনি বলেন, তোমরা দুইজন আমার কাছে এসো। আমরা ম্যামের কাছে গেলাম। ম্যাম বলেন, ইমি আমি তোমার সমস্যার কথা পড়েছি আর বুঝতে পারি যে সমস্যার মূল বিষয় টিফিন। ম্যাম মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলেন, আচ্ছা, টিফিন মানে কি মুখরোচক ভালো ভালো খাবার? তুমি কি জান এই টিফিনের সাথে মায়ের হাতের কত যত্ন জড়িয়ে থাকে। মা অনেক মমতা সহকারে সকলের জন্য টিফিন তৈরি করে। আর এই টিফিন নিয়ে তোমরা প্রতিযোগিতা শুরু করেছ। তোমাদের মধ্যে অনেকে আছে যারা টিফিন আনতে পারে না। কেননা, মা সময় করে টিফিন তৈরি করতে পারে না। যার মা যেমন সময় পায় তার মধ্যেই সকলকে টিফিন বানিয়ে দেয়। খাবার জন্য টিফিন হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত যা তোমাদের ক্ষুধা দূর করবে। কিন্তু খাবার জন্য টিফিন কখন এমন হবে না যে কার মা কত ভালো ও কত মুখরোচক টিফিন বানাতে পারে। তোমরা কি জান তোমাদের চারপাশে থাকা পথশিশু, ওরা খাওয়ার জন্য খাবার খুঁজে পায় না। ময়লা ঘাটাঘাটি করে না হলে ভিক্ষে করে খায়। আবার অনেকে আছে না খেতে পেয়ে মারা যায়। আরও কত নিদারুণ দৃশ্য যে আছে চারপাশে। আর তোমরা তো খেতে পাও। তারপরও ভালো খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা করো। একবার পথশিশুদের কথা ভেবে দেখো। নিজেকে ওদের পরিস্থিতিতে দাঁড় করালে বুঝতে পারবে যে তোমরা কত ভালো আছ। আমি তখন মুখ নিচু করে তাকিয়ে আছি। ভুল আমারও। ঝগড়া না করে মিথিলাকে বুঝালেই পারতাম। হঠাৎ মিথিলা আমার হাত ধরে বলে, সরি। শুধু শুধু তোকে আমি এত বাজে কথা শুনিয়েছি। আর কখনও আমরা টিফিন নিয়ে ঝগড়া করব না। আমরা আবার এক সাথে মিলেমিশে টিফিন করব। আমি তখন বলি, আমাকেও ক্ষমা করে দে। ঝগড়া না করে নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিলেই পারতাম। তখন হঠাৎ ঘন্টা পড়ে গেল। ম্যাম চলে যাবেন। আমি আর মিথিলা এক সাথে ম্যামকে বলি, ধন্যবাদ। আমাদের ভুলগুলোকে শুধরে দেয়ার জন্য।■
উৎস: 04. Sahitto / Story September 2026.doc · টিফিন
