|

শেষের ফলক

শেষের ফলক
ছোটদের ভুবন — গল্প · সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইন্স ফিকশন — সেপ্টেম্বর ২০২৬

১.

আজ আমি লেখাটা লিখছি একটি বিশেষ ফলকের এর উপর। এটি এমন যৌগ দিয়ে তৈরি যা কখনোই মাটির সাথে মিশবে না। এক সময় এরকম যৌগ আমাদের ল্যাব অহরহই তৈরি হতো। তবে পরিবেশের ক্ষতি হয় বিধায় এই পদার্থটি ব্যবহার করা এখন নিষিদ্ধ। তাই এর উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি অনেক কষ্টে এই পদার্থ কিছুটা সংগ্রহ করেছি। আশা করি এটা পড়ার জন্য যদি কোন লোক বেঁচে থাকে তাহলে সে আমাদের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।

আমাদের সভ্যতা প্রযুক্তিতে এক উৎকর্ষ সাধন করেছে। আমরা প্রযুক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিলাম। আমরা প্রকৃতিকে আমাদের মত ব্যবহার করতাম। আমরা কখনোই প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করার কোন উদ্যোগই গ্রহণ করিনি। আমরা অনেকটাই উদ্ধত হয়ে গিয়েছিলাম। পূর্বের অনেক সভ্যতার মত আমরাও যে কোনো সময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারি তা আমরা কখনো কল্পনাই করতে পারতাম না। আর আমাদের বিশ্বাস ছিল পূর্বের সব জাতি থেকে আমরাই সবচেয়ে উন্নত। কিন্তু এখনকার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আরো উন্নত জাতিও হয়তো আমাদের মত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

আমাদের জাতি নৈতিকভাবে খুবই অধঃপতিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের হাবভাব দেখে মনে হতো তারা স্রষ্টার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে। তাদের ভাবখানা এমন ছিল যেন তারা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টি করেছে। তারা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে যেন এটাই বুঝাতে চায়। তারা প্রকৃতিকেই ধ্বংস করতে শুরু করে যা আমাদের ও তাদের সবার বাঁচার জন্য অপরিহার্য ছিল। তাই অবধারিতভাবেই প্রকৃতিও যেন তাদের ওপর প্রতিশোধ নিলো। যার ফলস্বরূপ আমাদের পুরো সভ্যতাই এখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

২.

ফলকে লেখাটি যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল। অনেকদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে অবশেষে লেখাটি উদ্ধার করতে পেরেছে রাফান। এ যাবত পাওয়া মায়ান সভ্যতার সর্বশেষ নিদর্শন এই লেখাটি। এই প্রথম মায়ান ভাষায় লিখিত এত বড় কোন লেখা পাওয়া গেল। এ লেখাটি পড়ে রাফানের কাছে মায়ান সভ্যতার অনেক ধোঁয়াটে ইতিহাসই বেশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ইতিপূর্বে মায়ান ভাষার খুব কম লেখাই বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পেরেছিল। মায়ান ভাষার কাছাকাছি খুব বেশি ভাষাও নেই। কিন্তু রাফান ও তার সহকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা বহু কষ্টে এই লেখাটি পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

রাফান খুবই আশ্চর্য লেখাটির বিষয়বস্তু পড়ে। এতদিনে মায়ান সভ্যতার ধ্বংসের কারণটা জানতে পেরেছে সে। বিজ্ঞানীরা এর আগে অনেক নিদর্শন পেয়েছে যাতে আঁচ করা যায় মায়ান সভ্যতা অনেকটাই উন্নত ছিল। কিন্তু তারা বিশ্বাসই করতে চাইত না মায়ান সভ্যতা বর্তমান সভ্যতার চেয়েও উন্নত হতে পারে। তারা ভাবতো মায়ান সভ্যতা হয়তো সাধারণ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেই ধ্বংস হয়ে থাকবে। যা তারা প্রযুক্তির দ্বারা ইতিমধ্যে মোকাবেলা করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু ফলকের লেখাটি পড়ে আজ রাফানের অনেক বড় একটি ভুল ভাঙলো। সে বুঝল প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কত ভয়াবহ।

রাফান অবাক হয়ে ভাবলো পূর্বের মায়ান সভ্যতার সাথে বর্তমান সভ্যতার অদ্ভুত মিলের কথা। এই যেমন মায়ান সভ্যতা উন্নত হওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ থাকার পরও এখনকার বিজ্ঞানীরা তাদের নিজেদের চেয়ে উন্নত ভাবতে পারছিল না। তারা নিজেদেরই সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবে। কিন্তু ফলকে ব্যবহৃত পদার্থটাই প্রমাণ করে তারা কতটা উন্নত ছিল।

এতদিন সেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় করত না। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারল প্রাকৃতিক বিপর্যয় কত মারাত্মক হতে পারে। রাফান ভাবল পৃথিবীতেও যে কোন সময় দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। কারণ আস্তে আস্তে এখানকার প্রকৃতিও ধ্বংসের জন্য উপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সে আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে দ্রুত সেই ফলকের লেখাগুলো তাদের প্রধান বিজ্ঞানীর কাছে পাঠিয়ে দিল এবং তাকে পৃথিবীর এরূপ পরিণতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করলো।

যাক! এখন রাফান খানিকটা স্বস্তি পেল। তাদের বিজ্ঞানীদের উপর তার যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। রাফান ঘড়ির দিকে তাকালো। ওমা! এত রাত হয়েছে রাফান তো তা খেয়ালই করেনি। রাফান নিশ্চিত মনে ঘুমাতে গেল।

৩.

রাত তখন দুইটা বাজে।

হঠাৎ রাফানের বিছানাটি প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠল। সে বুঝতে পারলো পৃথিবীর ধ্বংস ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।

লেখক: আহমদ আনাস আবদুল্লাহ · সাইন্স ফিকশন · সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ছোটদের ভুবন — গল্প