|

বগুড়া ও মহাস্থানগড়

বগুড়া ও মহাস্থানগড়
ছোটদের ভুবন — ভ্রমণ · সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভ্রমণ কাহিনী

বগুড়া ও মহাস্থানগড়

— সাদিকা মালিহা সখ

অনেকেই আমার মতো ঘোরাঘুরি করতে ভীষণ পছন্দ। আজ আমি আমার ঘোরাঘুরির ছোট ছোট কিছু লিখছি। আমার ঘোরাঘুরির স্থানটা বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়।

ভ্রমণে যাবার আগেই আমি বগুড়া জেলা ও মহাস্থানগড় সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করেছি, যাতে আমাদের ঘুরে বেড়ানোটা আরো প্রাণবন্ত হয়।

উত্তরবঙ্গের প্রবেশ দ্বার হিসেবে খ্যাত বগুড়া জেলা। যেটি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি শিল্প ও পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা। বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসির উদ্দিন বগরা খানের নাম অনুসারে বগুড়ার নামকরণ করা হয়। মহাস্থানগড় বগুড়ার একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সুফি, লালন ও মারাটি সংস্কৃতি মিশে একাকার হয়ে গেছে। বগুড়া জেলা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৭নং সেক্টরের অধীনে ছিলো। এছাড়া মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী একসময় পুন্ড্রনগর নামে পরিচিত ছিলো। অবাক করা ব্যাপার এটি একসময় বাংলার রাজধানী ছিলো। ২০১৬ সালে এটিকে সার্কের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এটি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত।

আমরা রাত ৯:৪৫ মিনিটে লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে ট্রেনে রওনা হলাম কমলাপুর স্টেশন থেকে। আমার আমি, মা আর ছোট ভাই- এ হলো আমাদের ভ্রমণগ্রুপ। প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ও শুকনো খাবার নিয়ে ট্রেনের সঙ্গী হলাম। ট্রেন ছাড়লো যথাসময়ে। সময়টা মাঘ মাস তাই কুয়াশা আর ভীষণ ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া রাত পার করে খুব ভোরে পৌঁছে গেলাম বগুড়া স্টেশনে। স্টেশনে দুপা দিয়ে নামতেই সে এক অন্যরকম শীতল অনুভূতি। শীত এই প্রথম আমার জীবনে নতুন করে ধরা দিলো। শীতের প্রকোপ এতোটাই বেশি যে, এক পায়ের সাথে অন্য পায়ের এমনিতেই ধাক্কা লেগে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে এক চায়ের দোকানে গিয়ে নিজেদের সামলে বসলাম। সূর্যের আলো আরও একটু প্রখর হলে বেলা ৮টার দিকে অটোতে করে শহরে নতুন গড়ে ওঠা মম ইন পার্ক এন্ড রিসোর্টের পূর্ব নির্ধারণ করা কক্ষে প্রবেশ করলাম। ‘মাঘের শীত বাঘ কাঁপে’ প্রবাদটার প্রমাণ পেলাম বগুড়ায় এসে। বেলা ১০টায় হোটেল কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় একটা ট্যাক্সিতে করে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে মহাস্থানগড় ও জাদুঘর পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে টিকেট কাটলাম। ভেতররে ঢুকে মহাস্থানগড় ও জাদুঘরের বিভিন্ন পুরানো ও ঐতিহাসি ক পুরাকীর্তি দেখলাম। কষ্টি পাথরের মূর্তি তৎকালীন ব্যবহারিক মাটির আসবাবপত্র বিভিন্ন সালের মুদ্রা ও পোষাক দেখে জেনে নিলাম তখনকার জীবনধারণের বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য। যাদুঘরের মৌর্য, পাল, সেন ও অন্যান্য রাজ বংশের সোনা, রুপা, ব্রোঞ্জ, পাথর, কাসাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতব পদার্থ, পোড়ামাটির তৈরি মূর্তি, খোদাই করা ইট, শিলালিপি, আত্মরক্ষার নানা ধরনের অস্ত্র, প্রাচীন অলংকার ইত্যাদি ও সংরক্ষিত যা দেখে অবাক হওয়ার মতো।

বগুড়াতে সাধারণত মহাস্থানগড় ও জাদুঘরের ছাড়াও আরও কিছু ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে যা আমাদের জানার পরিধিকে আরো সমৃদ্ধি করবে। সাধারণত ওই সকল দর্শনীয় স্থানের কথা শোনা যায় না। যেমন- বিহার ধাপ, পরশুরামের প্রাসাদ, মানকালীয় কুন্ড, ভাসু বিহার, যোগীর ভবন, সঙ্ঘানকোট স্তূপ, গবিন্দ ভিটা, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগীর ভিটাসহ নানা ঐতিহাসিক প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন।

মঙ্গলকোট স্তূপ মহাস্থানগড় থেকে ১ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। মহাস্থানগড়ের পশ্চিমে কালীসহ সাগর এবং পদ্মাদেবীর বাসভবন। জাদুঘরের ঠিক সামনেই গোবিন্দ ভিটা। মহাস্থানগড়ের বাসস্ট্যান্ড থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে একটি বৌদ্ধ স্তম্ভ রয়েছে যা সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন। এর উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। এটাই বেহুলার বাসরঘর নামে পরিচিত। এ সকল স্থাপনাগুলো কাছাকাছি ও একই জায়গাতে হওয়ায় খুব কম সময়ে দেখে শেষ করা যায়। সময় ঘড়ির কাটায় ১টা। ছবি তোলা আর ঘুরতে ঘুরতে খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। দুপুরে ছোট্ট একটা হোটেলে আলুর বাটামে আর আলুর ডাল সাথে সাধারণ ভাত মাছ খেয়ে নিলাম তৃপ্তি সহকারে। একটু বলে রাখি বগুড়া জেলা আলুর জন্য বিখ্যাত। তাই এখানকার প্রতি ঘরেই প্রতিদিন আলুর নানা পদ থাকেই। যেমন— আলুর কাজর, আলুর ডাল, আলুর বাটাম, আলু খাটি ইত্যাদি। আমার কাছে আলুর বাটাম দারুণ লেগেছে। বেলা বাজে ৩টা। হাতে সময় কম, তাই দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম পরবর্তী ও শেষ জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য।

প্রতিবছর বাংলা সনের মাঘ মাসের শেষ তিনদিনের মধ্যে আগত বুধবার অথবা ফাল্গুন মাসের প্রথম বুধবার বইমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে এখানে। আমরা বইমেলা পেলাম। মেলায় পৌঁছাতে ৫টা বেজে গেলো। ওখানে এসে জানলাম এই মেলা জামাইমেলা, মাছেরমেলা, পোড়াদহমেলাও ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও পরিচতি। এমন মেলার গল্প শুনেছি কিন্তু দেখিনি। তবে এবার দেখে খুবই রোমাঞ্চকর লাগলো। এ মেলার প্রধান আকর্ষণ মাছ। বধুরা স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি আসে এবং মেলায় কেনাকাটা করে। মেলায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আনন্দ পেয়েছি। ম্যাজিক খেলা দেখেছি। কিছু টাকার বিনিময় দুটো ছোট ছোট ম্যাজিক শিখেছি। মেলায় ছিল যাত্রাপালা, সার্কাস আর পুতুল নাচ। ২০ টাকার লটারিতে পায়ের এক জোড়া নুপুর জিতেছি। এছাড়া স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও প্রদর্শিত হচ্ছিল। সময় স্বল্পতার কারণে সবকিছু দেখা হলো না। তবে অনেক বড় বড় মাছ কিনতে ও বেচতে দেখেছি। একেকটা মাছ এক-দেড় মনেরও বেশি। প্রায় শতেকখানি মাছের দোকানের পসরা অভূতপূর্ব। সময় রাত আটটা। ঘড়ির কাটা বলছে ফিরতে হবে। ১১টায় নিটনিয়া স্টপেজ থেকে আমাদের গাড়ি। তাই মেলায় ঘোরা অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে এলাম ৯টায় বাস স্টপেজে।

বগুড়া যাবো আর দই খাবো না তা কি হয়। এবার দই খাওয়ার অভিজ্ঞতা বলি। মেলা থেকে কিনেছিলাম কটকটি, কদমা, বকুল দানাদার আর বারো ভাজা। এসব আমার স্কুলে ও কাছের বন্ধুদের দেবো বলে বেশি করে কিনেছি। বিখ্যাত দোকান এশিয়ান সুইটস আর চিজনিপাতার দই থেকে ভাড় ও সরা দই নিয়ে নিলাম। ঘি আর ‘চিকন সেমাই’ নিলাম। চিকন সেমাইও বগুড়ার বিখ্যাত পণ্য। আপনজন আর বন্ধু প্রতিবেশিদের জন্য আলাদা আলাদা। জেনে রাখা ভালো বগুড়ার দই জিআই পণ্য। ২০২৩ সালে ২৬ জুন বগুড়ার দই জিআই পণ্যের তালিকায় স্থান পায়। সারাদেশে দই পাওয়া গেলেও বগুড়ার দইয়ের স্বাদ অতুলনীয়। বগুড়ার দই খেয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও। রাতে দই চিড়ে খেয়ে বাসে বসে ঢাকায় ফেরা।

ও হ্যাঁ ছোট করে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা বলে যাই; কারণ ভ্রমণের পুরো অংশ যে ভালো লাগার হয় তা কিন্তু নয়। পথে চলতে গেলে নানা রকম প্রতিকূল অবস্থায়ও পড়তে হয় কখনো কখনো। সাবধানতার জন্য বা বিপদমুক্ত থাকার জন্য এসব বিষয়ও জেনে রাখা জরুরি।

আমরা লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে শোভন চেয়ারে যাচ্ছিলাম। আমাদের বরাবর ও পাশের সিটে দুজন ভদ্র মহিলা। মা ও মেয়ে প্রথমবার ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন একা। কোন পুরুষ লোক সাথে না থাকায় তারাও আমাদের সাথে মিলে আমাদের মতো যাচ্ছিলেন। একটা স্টেশনে ট্রেন কিছু থামে। ট্রেনটি চাড়ার মুহূর্তে ওনাদের কাছ থেকে ছিনতাইকারী ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেলো জানালা দিয়ে। যা ভীষণ দুঃখজনক ছিলো। প্রয়োজনীয় টাকা, মোবাইল আর প্রেসক্রিপশন ছিলো। কী ভীষণ যন্ত্রণার ছিল ওই মুহূর্তটা ওনার! ভয় পেয়েছিলেন এবং প্রেসক্রিপশনের জন্য কান্নাকাটি করছিলেন। আমরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম আর ফিনেন্সিয়াল সহযোগিতাও করেছিলাম।

যা হোক সকল ভ্রমণ আনন্দের হোক। আমরা নিরাপদে থাকি। এছাড়া আরও একটা ব্যাপার না বললেই নয়, বেহুলার বাসরঘর, গোবিন্দ ভিটা এবং মহাস্থাননগড় ভীষণ অরক্ষিত ও অপরিচ্ছন্ন। প্রতিটি জায়গায় টিকেট কেটে ঢুকতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন এই শত শত পর্যটকের কাটা টিকেটের মূল্যে নিদর্শনগুলোর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। টিস্যু, প্লাস্টিকের বোতল, চিপস চকোলেটের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট ভীষণ নোংরা হয়ে আছে পরিবেশ। সেখানকার দায়িত্বে যারা আছেন, পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায় তারা ভীষণ দায়িত্বহীন। তাদের কর্তব্যে অবহেলা আর সাধারণ দর্শনার্থীদের হীন মানসিকতা- এ দুই মিলে পরিবেশটা নষ্টের জন্য দায়ী বলে আমার মনে হয়েছে। মহাস্থানগড়ের গাথুনির ফাঁকে মাদক সেবনকারী ও উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের যুগলবন্দি বসে থাকাটাও দৃষ্টিকটু। আমরা যারা বাবা-মা, ভাই-বোন এক সাথে যাই, তখন তাদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বৈকি।

পরিশেষে আমাদের সকলের সচেতনতা, মানবিকতা, সাবধানতাই নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করবে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের। ভ্রমণ হোক আনন্দের। ভ্রমণ হোক জানার ও কৌতূহলের।

উৎস: 03. Chottoder Vubon / September 2026.doc · বগুড়া ও মহাস্থানগড়